জ্বালানি বিভাগের সঙ্গে বৈঠকে লোয়াবের দাবি

এলপিজির মজুদ পর্যাপ্ত, সংকট তৈরি করছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা

দেশের বাজারে দুই সপ্তাহ ধরে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তীব্র সংকট। বেশি দাম দিয়েও অনেক জায়গায় সিলিন্ডার পাচ্ছেন না গ্রাহক। হঠাৎ করেই তৈরি এ পরিস্থিতির জন্য স্থানীয় খুচরা বিক্রেতাদের দায়ী করেছে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)।

দেশের বাজারে দুই সপ্তাহ ধরে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) তীব্র সংকট। বেশি দাম দিয়েও অনেক জায়গায় সিলিন্ডার পাচ্ছেন না গ্রাহক। হঠাৎ করেই তৈরি এ পরিস্থিতির জন্য স্থানীয় খুচরা বিক্রেতাদের দায়ী করেছে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)। সংগঠনটির দাবি, দেশে এলপিজির প্রকৃত কোনো ঘাটতি নেই এবং অপারেটর পর্যায়ে রয়েছে পর্যাপ্ত মজুদ। মূলত বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে খুচরা পর্যায়ের কিছু ব্যবসায়ী কম গ্যাস সরবরাহ করায় সাধারণ ভোক্তাদের ভোগান্তি বাড়ছে।

এলপিজি সংকট ও বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে গতকাল বিকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠক হয়। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে লোয়াবের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। তারা দাবি করেন বর্তমানে দেশে এলপিজির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। তবে বৈঠকে এলপিজি অ্যাসোসিয়েশন ও আমদানিকারকরা জানান, চলতি মাসে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়াতে পারে—এমন ধারণা থেকে খুচরা বিক্রেতারা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে। সে কারণেই মূলত বাজারে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বাজারে স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে খুচরা পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো এবং প্রয়োজন হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়েও আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।

এদিকে জানুয়ারির জন্য এলপিজি সিলিন্ডারের দাম গতকাল ঘোষণা করেছে বিইআরসি। ১২ কেজি সিলিন্ডারের মূল্য গত মাসের চেয়ে ৫৩ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ডিসেম্বরে এর দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল কমিশন। যদিও বিইআরসির দামে দেশের কোথাও এলপিজি পাওয়া যায় না বলে জানিয়েছেন ভোক্তারা। আর বর্তমানে অনেক এলাকায় সিলিন্ডারই পাওয়া যাচ্ছে না। যেসব এলকায় মিলছে কমিশন নির্ধারিত দামের চেয়ে ৭০০-৮০০ টাকা বাড়তি দিয়ে কিনতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এলপিজি নিয়ে চলমান এ সংকট সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ উঠে আসে। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন বলে জানান লোয়াব নেতারা। এজন্য তারা উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিসভা বিভাগকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ জানান। সেই সঙ্গে এলপিজি অপারেটররা এলসি (ঋণপত্র) খোলার প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট হ্রাসের দাবি জানান। একই সঙ্গে আমদানি পর্যায়ে কোনো ধরনের সিলিং না রাখার আহ্বান জানিয়েছে লোয়াব। সংগঠনটির মতে, আমদানিতে বিধিনিষেধ থাকলে সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং সুযোগ তৈরি হয় কৃত্রিম সংকটের।

বৈঠক শেষে জ্বালানি বিভাগের পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশে এলপিজির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। স্থানীয় খুচরা বিক্রেতারা বাজারে পণ্যটির কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। যদিও বিশ্ববাজারে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি, জাহাজ সংকট এবং কিছু কার্গোর ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় এলপিজির সংকট সৃষ্টির জন্য কিছুটা দায়ী। এছাড়া বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম নির্ধারণ করা হয় পণ্যটির। ফলে চলতি মাসে এর দাম বাড়তে পারে, এমন ধারণা থেকে খুচরা বিক্রেতারা কৃত্রিমভাবে এলপিজির সংকট তৈরি করেন বলে জানান লোয়াব নেতা ও আমদানিকারকরা।

দেশের বাজারে প্রতি মাসে এলপিজির সরবরাহ থাকে গড়ে ১ লাখ ২০ হাজার টন। গত নভেম্বরে অবশ্য আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫ হাজার টন। ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ২৭ হাজার টনে। আমদানি বৃদ্ধির পরও বাজারে এলপিজি সরবরাহ কমার যৌক্তিক কোনো কারণ পায়নি মন্ত্রণালয়।

এদিকে গতকাল লোয়াব এক বিবৃতি দিয়ে জানায়, বাজারে এলপিজির পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। তবে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি, ইউরোপে গ্যাসের চাহিদার কারণে দেশে সরবরাহে কিছুটা বিঘ্ন হচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধির পেছনে অবশ্য খুচরা কিছু ব্যবসায়ী দায়ী বলে দাবি করে লোয়াব। তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয় লোয়াবের সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।

বৈঠকে আলোচনার বিষয়ে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে লোয়াবের এক সদস্য বণিক বার্তাকে জানান, সংগঠনের পক্ষ থেকে এলপিজি আমদানির সিলিং তুলে দেয়ার বিষয়ে আহ্বান জানানো হয়। জ্বালানি বিভাগ এ সিলিং উঠিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এলপিজি আমদানিকারকদের জন্য বাংলাদেশে ব্যাংকের সুদহার সহনীয় পর্যায়ে রাখার কথাও বলা হয়েছে। জ্বালানি বিভাগ বিষয়টি অনুরোধ করে দ্রুত বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি চিঠি দেবে। এছাড়া এলপিজি আমদানিতে ভ্যাট, ইনকাম ট্যাক্স সহজীকরণ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সুদহার সহনীয় পর্যায়ে রাখার বিষয়টি নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়।

আরও